
শিক্ষা নীতি, শিক্ষা ভীতি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে আছে। এতে কিন্তু অনেকেরই সুবিধা!
কিভাবে?
খারাপ শিক্ষাব্যবস্থা = খারাপ জ্ঞান = খারাপ মেধা = পরিশেষে অশিক্ষিতের-মত জনগণ/নাগরিক
অশিক্ষিত জনগন বা নাগরিক থাকার সুবিধা কি?
তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সুপার ইজি!
তাদের আবেগ থাকবে, কিন্তু তেমন যুক্তি-বুদ্ধি থাকবেনা।
এতে কি সুবিধা?
অনেক সুবিধা!
যেমন?
ভাল-মন্দ জ্ঞান থাকবেনা; উচিৎ-অনুচিত বোঝার ক্ষমতা থাকবেনা, ইত্যাদি।
অনেক সুবিধার মধ্যে সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে, যেহেতু জ্ঞানের মান খারাপ, কাজেই তাদের দিয়ে কম দামে কাজ করিয়ে নেয়া যাবে। সহজ কথায় লেবার প্রাপ্তি সহজ হবে।
কেননা, অশিক্ষিত নাগরিক ছাড়া কে আসবে কম দামে কাজ করতে?
ব্রিটিশরা কিন্তু অনেক চালাক! তারা এই ব্যাপারটা কয়েকশত বছর আগেই বুঝতে পেরেছিল।
কাজেই তারা শিক্ষা এবং চাকরির এমন একটা সিস্টেম করে দিয়ে গেল, যাতে আমরা দাসত্ব থেকে বেরই না হতে পারি।
তারপরের শতশত বছর আমরা কিভাবে সেই সিস্টেমকে নিজেদের উপর আরও খারাপ ভাবে প্রয়োগ করা যায় সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে।
আমাদের বর্তমান মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী, আ ন মএহসানুল হক মিলন সাহেবের প্রসঙ্গে।
ভদ্রলোকের আরেকটা প্রচলিত নাম আছে, “হেলিকপ্টার মিলন”।
বিশ্বাস করুন মানুষ তার এই “হেলিকপ্টার মিলন” নামটা তাকে শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাকে ভয় পেতে ব্যবহার করতো বা করে। তাকে অসম্মান করার জন্য নয় নিশ্চয়ই।
কেন এই নাম?
কারন তিনি (সম্ভবত ২০০১-০৬ বা সেই সময়কালে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে) হেলিকপ্টারে করে ঘুরে বেরিয়েছিলেন পরীক্ষায় নকলের হাত থেকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীকে রক্ষা করতে। নকল মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন তিনি। কঠিন হস্তে তিনি সম্ভব সবকিছু করেছেন এবং অনেকটা সফলও হয়েছেন।
তার এই কর্মকাণ্ড সকলেই ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করেছিলেন। কেননা পরিক্ষায় নকলের খপ্পরে পরে প্রকৃত মেধাবীদের সঠিক মূল্যায়ন করা যাচ্ছিলোনা। এবং “সহজ সুযোগ” বিবেচনায়, অনেক শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছিলোনা। সেই সময়কাল বিবেচনায় “নকল বা পরিক্ষায় নকল” টাই ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা গুলোর একটি।
আমাদের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর তৎকালীন গৃহীত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সেই সময়ে দারুণ পদক্ষেপ ছিল। যেটা শিক্ষার্থীদের এই সঠিক বার্তাটা দিয়েছিল যে, “পড়াশোনা করে তবেই সফলতা নিশ্চিত করতে হবে।”
—
এবার বর্তমানে আসি-২০২৬ সাল।
বিগত ১৬-১৭ বছর রাজনৈতিক কারণে মন্ত্রী মহোদয় বাংলাদেশে ছিলেন না। কিন্তু সময়টা তিনি অপচয় করেন নি। পড়াশোনা করেছেন; আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়া থেকে ২০১৮ সালে “বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ভূমিকা” বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। নিঃসন্দেহে চমৎকার উদ্যোগ।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর, আ ন মএহসানুল হক মিলন সাহেবকে এবার শিক্ষামন্ত্রী করা হল।
আমরা সবাই খুশি হলাম। ভাবলাম এবার অন্তত সঠিক হাতে আমাদের শিক্ষার দায়িত্বটা গেছে। কাজেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যে দীর্ঘদিনের যে সমস্যা সেটা এবার নিশ্চয়ই সমাধান তিনি করবেন।
প্রথম কিছুদিন তার কথাও ভালো লাগলো।
কিন্তু কিছুদিন যেতেই আমরা লক্ষ্য করলাম তার কথা ঘুরে ফিরে সেই ১৫-২০ বছর আগের “নকল বা পরিক্ষায় নকল” ব্যাপারটাতেই আটকে থাকছে।
আমরা একটু আশ্চর্য হলাম। “নকল বা পরিক্ষায় নকল” তো বর্তমানে আমাদের মূল সমস্যা নয়।
বরং শিক্ষার বিষয়, পাঠদান পদ্ধতি, এবং ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানেরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে (যেমনঃ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবটিক্স, কোয়ান্টাম কমপিউটিং, সাইবার সিকিউরিটি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ইত্যাদি) সেই বাস্তব বিষয়গুলোকে জ্ঞান এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কিভাবে দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়, যার মাধ্যমে আমাদের সন্তানেরা ভবিষ্যতে নিজের, পরিবারের এবং দেশের দায়িত্ব গ্রহণ এবং পালন করতে পারবে সেটাই বর্তমান সময়ে আমাদের বড় সমস্যা।
আমার দৃষ্টিতে, স্কুলে পড়াশোনার পর বাসায় যেন আবার পড়াশোনা করার প্রয়োজন যেন না পরে এমন শিখন পদ্ধতি। বাচ্চাদের যেন বইয়ের ভারে শৈশব নষ্ট না হয় সেই বিষয়গুলো মনোযোগ দেয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আরও আছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির বৈদেশিক আয় সেই এক “গার্মেন্টস এক্সপোর্ট” শিল্পের মদ্ধেই আটকে আছে। সেটা খুব দ্রুত পরিবর্তন করে কিভাবে অন্য শিল্প গুলোও এক্সপোর্টের মাধ্যমে দেশের দায়িত্ব নিতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা, জ্ঞান, দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরী।
কিন্তু, মিলন সাহেবের অতীত সাফল্যকে তিনি সম্ভবত নিজের কেপিআই হিসেবে ধরে নিলেন।
তিনি “নকল বা পরিক্ষায় নকল” ব্যাপারটাতে যত সময় দিতে লাগলেন, তত সময় মনে হয় বর্তমান সমস্যাকে চিহ্নিত করার জন্য দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না।
গত সপ্তাহে, অতিবৃষ্টির ফলে সারা দেশেই কম-বেশি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় অনেকেই ঠিক মত ঘরেই থাকতে পারছেন না কারণ ঘরেও পানি উঠে গেছে। চট্টগ্রাম শহর পানিতে তলিয়ে গেছে কাজেই লোকজন ঠিকমত যাতায়াত করতে পারছে না। ঢাকার অনেক রাস্তাতেও একই অবস্থা। অনেক জেলা শহরেই একই ব্যাপার।
আমার ধারণা ছিল, এই আপদকালীন সময়টা পার হওয়া পর্যন্ত সকল পরীক্ষা স্থগিত করা হবে। কেননা এটাইতো যৌক্তিক।
কিন্তু মিলন সাহেব কি নিজের ক্ষমতা দেখাতে চাইলেন কিনা ব্যাপারটা পরিষ্কার না।
জোর করেই পরীক্ষা নিয়েই ছাড়বেন। শিক্ষার্থীদের সমস্যা তো আর মিলন সাহেবের নিজের সমস্যা নয়। কেননা তিনি নিজে চলাচল করেন প্রাইভেট গাড়িতে। হেঁটে, রিক্সায় বা বাসে চলা শিক্ষার্থীদের সমস্যা তার বোঝার দরকার কি! তাছাড়া উনার অযৌক্তিক কথার মেশিন তো আছেই।
শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতি হওয়া অযৌক্তিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করছে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের আমরা শিক্ষার্থী মনে করছিনা, তাদের শত্রু মনে করছি!
কি আশ্চর্য!
শিক্ষার্থীরা তো রাস্তায় থাকার কথা না। তারা যেন পড়াশোনা ঠিক মত করে পরীক্ষা দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করাটা তো খুব বেশি কঠিন বিষয় হবার কথা নয়।
অতি সহজেই যে সমস্যার সমাধান করা যায়, কেন জানি সেটাকে জোর করে কঠিন বানিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে! কারা করছে, কেন করছে – তা জানি না।
আমরা কি অতীত থেকে শিক্ষা নিতে এতই অপছন্দ করি!
নোটঃ লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। পাঠক অবশ্যই ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন। আশা করি সকলে ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। এবং ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটা অনুধাবন করার চেষ্টা করবেন। যৌক্তিক এবং গঠনমুলক আলোচনা-মতামত জানানোর সুযোগ সকলেরই আছে।
ধন্যবাদ,
সামথিং নাজমুল
