
কেন বাংলাদেশিরা আর্জেন্টিনা–ব্রাজিলকে এত ভালোবাসে?
বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই বাংলাদেশের চিত্র বদলে যায়। গ্রামের মেঠোপথ থেকে শহরের অলিগলি, সবখানে দেখা যায় আকাশী-সাদা আর্জেন্টিনার পতাকা, কিংবা সবুজ-হলুদ ব্রাজিলের পতাকা। কোথাও পুরো বাড়ির ছাদ রং করা হয়েছে দলের রঙে, কোথাও আস্ত একটা নদী বা ধানক্ষেত ব্যবহার করে বিশাল পতাকা তৈরি করা হয়। অথচ মজার বিষয় হলো, না আর্জেন্টিনার সাথে বাংলাদেশের কোনো ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে, না ব্রাজিলের সাথে। তারপরও এই দুটি দেশের জন্য বাংলাদেশের মানুষের আবেগ এমন তীব্র যে অনেক বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যটক একে রীতিমতো বিস্ময়ের বিষয় বলে মনে করেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই ভালোবাসার শুরুটা কোথায়, আর কেন তা আজও এত গভীরভাবে টিকে আছে?
গল্পের শুরু: টেলিভিশন যখন প্রথম বিশ্বকাপ নিয়ে আসলো
এই প্রেমের বীজ বোনা হয়েছিল সত্তর ও আশির দশকে। তখন বাংলাদেশে সবেমাত্র টেলিভিশনের প্রসার শুরু হয়েছে, আর স্যাটেলাইট সম্প্রচারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ঘরে বসেই বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার সুযোগ মিলছে মানুষের। সেই সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন ব্রাজিলের পেলে। তার তিনটি বিশ্বকাপ জয় এবং ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক, শৈল্পিক খেলার ধরন সারা বিশ্বের মতোই বাংলাদেশের দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিল। ফুটবলকে যারা শুধু খেলা নয়, এক প্রকার শিল্প বলে মনে করেন, তাদের কাছে ব্রাজিল হয়ে উঠল স্বপ্নের প্রতীক।
১৯৮৬: এক মানুষ যিনি বদলে দিলেন সব হিসাব
আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসার আসল বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে। দিয়েগো মারাদোনা একাই পুরো দলকে কাঁধে তুলে নিয়ে শিরোপা জিতিয়েছিলেন, যা ফুটবল ইতিহাসের সেরা একক পারফরম্যান্সগুলোর একটি হিসেবে আজও বিবেচিত হয়। মারাদোনার সেই জাদুকরী ড্রিবলিং আর লড়াকু মানসিকতা বাংলাদেশের তরুণদের মনে এমন গভীর ছাপ ফেলেছিল যে তখন থেকেই আর্জেন্টিনা পেয়ে যায় তার নিজস্ব বিশাল ভক্তগোষ্ঠী। অনেকের কাছে মারাদোনা ছিলেন কেবল একজন ফুটবলার নয়, বরং সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের প্রতীক।
নিজের দেশের অভাব পূরণ করল দূরের দুই দেশ
এই ভালোবাসা এত গভীরে শিকড় গাড়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ আছে। বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল কখনোই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপ চলাকালীন বাংলাদেশের মানুষের হাতে নিজের দেশকে সমর্থনের কোনো সুযোগ ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ তখন এমন একটি দলের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে চেয়েছে, যাদের খেলার ধরন, ইতিহাস আর রোমাঞ্চ তাদের ভালো লাগে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ঠিক সেই জায়গাটাই পূরণ করেছিল। নিজের দেশের অভাবটা পূরণ হয়েছিল দূরের দুটি দেশের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ঐতিহ্য
সময়ের সাথে সাথে এই সমর্থন একরকম পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। যে বাবা ছোটবেলায় পেলে বা জিকোর খেলা দেখে বড় হয়েছেন, তার সন্তানও বড় হয়ে ব্রাজিলের সমর্থক হয়েছে। আবার যিনি মারাদোনার ভক্ত ছিলেন, তার পরিবারে আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা চলে এসেছে পরের প্রজন্মে। এভাবে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল সমর্থন করাটা আর কেবল একটা পছন্দ নয়, বরং পরিবারের পরিচয়ের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাড়ায় পাড়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা: যেন নিজেরই দুটি দল
বাংলাদেশে এই সমর্থন এখন এক অর্থে স্থানীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। একই মহল্লার দুই পাশের বাড়ি ভিন্ন দুই দলের পতাকায় সাজে, কে কত বড় পতাকা তুলতে পারে তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে। রিকশা, নৌকা, এমনকি গরুর গায়েও দেখা যায় দলের রং। এই পুরো ব্যাপারটা অনেকটা নিজের দেশের মধ্যেই দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের লড়াইয়ের মতো কাজ করে, প্রতিবেশীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ রেষারেষি আর সম্প্রদায়গত পরিচয়ের একটা উৎস হয়ে ওঠে। আসলে কেউই দক্ষিণ আমেরিকার সাথে সরাসরি যুক্ত নয়, তবু উৎসবের আনন্দটা একদম নিজের।
একটা মানসিক টানও আছে
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার প্রতি এই ভালোবাসার পেছনে একটা মানসিক বা সাংস্কৃতিক সংযোগও কাজ করে। এই দুই দেশকে প্রায়ই ফুটবলে আবেগ, শৈলী আর জেদের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, ঠিক যেন প্রাণহীন কৌশলের বিপরীতে আবেগময় লড়াই। উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ এই আবেগ আর সংগ্রামের গল্পে নিজেদের কোথাও একটু খুঁজে পায়, যা হয়তো ইউরোপের ধনী আর কৌশলী ফুটবল শক্তিগুলোর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই ব্যাখ্যা সবার কাছে এক রকম নয়, তবে এটা ঠিক যে এই ভালোবাসা শুধু খেলার ফল দিয়ে মাপা যায় না।
এক ভালোবাসা যা থেমে নেই
আজ চার দশকেরও বেশি সময় পার করে এই ভালোবাসা আর কোনো ব্যাখ্যার অপেক্ষায় নেই, এটা এখন বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে গেছে। প্রতিটি বিশ্বকাপে নতুন করে রঙিন হয়ে ওঠে দেশ, নতুন প্রজন্ম যুক্ত হয় পুরনো এই উৎসবে। আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল হয়তো কখনো জানবেও না যে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একটি দেশ তাদের জন্য এত গভীরভাবে আবেগ লালন করে, কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটাই তাদের নিজস্ব এক বিশ্বকাপ উৎসব, যা প্রতি চার বছর পর পর নতুন করে প্রাণ পায়।
Something Nazmul
Writing Assistant: Claude AI
#SomethingNazmul
